Ads code

রাসূল (সাঃ)এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠ করাঃ

 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম


রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠ করাঃ


০১. ভূমিকাঃ

রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠ করা মুসলিমের জন্য নবী প্রেমিকের বহিঃপ্রকাশ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত-বরকত ও ক্ষমা পাওয়া এবং সম্মান বৃদ্ধির মাধ্যমও বটে।


০২. আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন :

﴿إِنَّ اللَّهَ وَمَلٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِىِّ ۚ يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
আল্লাহ নাবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর মালাইকারাও নাবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে মুমিনগণ! তোমরাও নাবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও [সূরা আহযাব : ৫৬]।


০৩. হাদীস :
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مَنْ صَلَّى عَلَىَّ صَلاَةً وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ
যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেনতার দশটি শুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হবে এবং তাঁর জন্য দশটি মর্যাদা উন্নীত করা হবে। [সুনান নাসাঈ ১৩০০ (ই. ফা)]।



 ০৪. ব্যাখ্যা :
৩/১. তাফসীর আহসানুল বায়ান :
এই আয়াতে নবী (সাঃ)-এর ঐ সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছেযা আসমানে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ফিরিশতাগণের নিকট বিদ্যমান। তা এই যে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাগণের নিকট নবী (সাঃ)-এর সুনাম ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণও নবী (সাঃ) এর উচ্চমর্যাদার জন্য দু'আ করেন। তার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীদেরকেও আদেশ করেছেনযেন তারাও নবী (সাঃ)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করে। যাতে নবী (সাঃ)-এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন দুই বিশ্ব একত্রিত হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যেসাহাবায়ে কিরামগণ আরজ করলেনইয়া রাসূলাল্লাহ! সালামের নিয়ম তো আমাদের জানা আছে (অর্থাৎ তাশাহহুদে 'আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিয়্যুপড়ি) কিন্তু আমরা দরূদ কিভাবে পড়বএর উত্তরে তিনি দরূদে ইবরাহিমী -- যা নামাযে পাঠ করা হয় তা বর্ণনা করলেন [বুখারীঃ তাফসীর সূরা আহ্যাব]।



এ ছাড়া হাদীসে দরূদের আরো অন্য শব্দ বর্ণিত হয়েছেসেগুলিও পাঠ করা চলবে। সংক্ষেপে (صَلَّى اللهُ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ وَسَلَّم) পাঠ করা যাবে। পক্ষান্তরে (اَلصَّلَوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ) পাঠ করা এই জন্য ঠিক নয় যেএতে নবী (সাঃ)-কে সরাসরি সম্বোধন করা হয় এবং এই শব্দগুচ্ছ সাধারণ দরূদে নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়নি। আর যেহেতু তাশাহহুদে 'اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِيُّশব্দ নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে সেহেতু (তাশাহহুদে তা পাঠ করাতে কোন দোষ নেই। তা ছাড়া (اَلصَّلَوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ) পাঠকারী এই বাতিল বিশ্বাস নিয়ে পাঠ করে যেনবী (সাঃ) তা সরাসরি শ্রবণ করেন। এই বাতিল বিশ্বাস কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী। সুতরাং এই আকীদা নিয়েও নিজেদের মনগড়া দরূদ পাঠ করা ঠিক নয়। অনুরূপ আযানের পূর্বে তা পাঠ করাও বিদআতযাতে সওয়াব নয়বরং গুনাহ হয়। হাদীসে দরূদের বড় গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। নামাযে তা পাঠ করা ওয়াজেব না সুন্নতঅধিকাংশ উলামাগণ বলেছেন সুন্নত এবং ইমাম শাফেয়ী ও আরো অনেকে তা ওয়াজেব বলেছেন। তবে একাধিক হাদীসে তার ওয়াজেব হওয়ারই সমর্থন পাওয়া যায়। অনুরূপ হাদীস দ্বারা এটাও বোঝা যায় যেযেমন শেষ তাশাহহুদে দরূদ পড়া ওয়াজেব তেমনই প্রথম তাশাহহুদেও দরূদ পাঠ করা ওয়াজেব


নিম্নে তার কতিপয় দলীল দেওয়া হলঃ-
প্রথম প্রমাণ এই যেমুসনাদে আহমাদে সহীহ সানাদে বর্ণিত হয়েছে যেএক ব্যক্তি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেনইয়া রাসূলাল্লাহ! সালামের নিয়ম তো আমাদের জানা আছে (অর্থাৎ তাশাহহুদে 'আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিয়্যুপড়ি) কিন্তু আমরা নামাযে দরূদ কিভাবে পড়বএর উত্তরে তিনি দরূদে ইবরাহিমী শিক্ষা দিলেন [আল ফাতহুর রাববানী ৪/২০-২১]।



মুসনাদে আহমাদ ছাড়াও উক্ত হাদীস সহীহ ইবনে হিববানসুনানে কুবরা বায়হাকীমুস্তাদরাক হাকেম এবং ইবনে খুযায়মাতে বর্ণিত হয়েছে। এতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যেযেমন তাশাহহুদে সালাম পড়া হয় অনুরূপ উক্ত প্রশ্নও নামাযের ভিতরে দরূদ পাঠ সম্পর্কে ছিলউত্তরে নবী (সাঃ) দরূদে ইবরাহিমী পড়ার আদেশ দিয়েছিলেন। যাতে বোঝা যাচ্ছে যেসালামের সাথে দরূদও পড়া দরকার এবং তা পড়ার স্থান হল তাশাহহুদ। আর হাদীসে তা সাধারণভাবে বর্ণনা হয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় তাশাহহুদের সাথে নির্দিষ্ট করা হয়নি। যার ফলে বলা যায় যেপ্রথম ও দ্বিতীয় উভয় তাশাহহুদেই সালাম ও দরূদ পড়তে হবে

যে বর্ণনাগুলিতে প্রথম তাশাহহুদ দরূদ ছাড়া উল্লেখ হয়েছে সেগুলিকে সূরা আহযাবের আয়াত 'صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْاঅবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের ধরা হবে। কিন্তু উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর অর্থাৎ পঞ্চম হিজরীর পর যখন নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কিরামগণের প্রশ্নের উত্তরে দরূদের শব্দও বর্ণনা করে দিলেনতখন নামাযে সালামের সাথে দরূদ পড়াও জরুরী হয়ে গেলচাহে তা প্রথম তাশাহহুদ হোক বা দ্বিতীয়

আরো একটি প্রমাণ হলআয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, "নবী (সাঃ) কখনো কখনো রাত্রে নয় রাকআত নামায পড়তেনআট রাকআতে যখন তাশাহহুদে বসতেনতখন তাতে তাঁর প্রভুর নিকট দু'আ করতেন এবং তাঁর পয়গম্বরের উপর দরূদ পড়তেন তারপর সালাম না ফিরে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নয় রাকআত পূর্ণ করে পুনরায় তাশাহহুদে বসতেনতাঁর প্রভুর নিকট দু'আ করতেন এবং তাঁর পয়গম্বরের উপর দরূদ পড়তেন এবং পুনরায় দু'আ করতেনতারপর সালাম ফিরতেন [বায়হাকী ২/৭০৪নাসাঈ ১/২০২বিস্তারিত দেখুনঃ আল্লামা আলবানীর সিফাতু সালাতিন্নাবী ১৪৫ পৃষ্ঠা]।



উক্ত বর্ণনায় পরিষ্কার উল্লেখ আছে যেনবী (সাঃ) তাঁর রাত্রের নামাযে প্রথম ও শেষ উভয় তাশাহহুদে দরূদ পড়েছেন। এটা যদিও নফল নামাযের কথা ছিলতবুও নবী (সাঃ)-এর উক্ত আমল দ্বারা উল্লিখিত ব্যাপক দলীলসমূহের সমর্থন হয়। যার ফলে তা শুধু নফল নামাযের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়




৪/২. তাফসীর যাকারিয়া :
আরবী ভাষায় সালাত শব্দের অর্থ রহমতদো'আ প্রশংসা। অধিকাংশ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর নবীর প্রতি যে সালাত সম্পৃক্ত করা হয়েছে এর অর্থআল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন। তার কাজে বরকত দেন। তার নাম বুলন্দ করেন। তার প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেন। ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তার উপর সালাত প্রেরণের অর্থ হচ্ছেতারা তাকে চরমভাবে ভালোবাসেন এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করেনআল্লাহ যেন তাকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেনতার শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাকে সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেন। তার উপর রহমত নাযিল করেন। আর সাধারণ মুমিনদের তরফ থেকে সালাতের অর্থ দো'আ ও প্রশংসার সমষ্টি। এ আয়াতের তাফসীরে আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আল্লাহ তা'আলার সালাতের অর্থ আল্লাহ কর্তৃক ফিরিশতাদের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও প্রশংসা করা। [সহীহ বুখারীকিতাবুত্তাফসীর]



আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান দুনিয়াতে এই যেতিনি ফিরিশতাদের কাছে তার কথা আলোচনা করেন। তাছাড়া তার নামকে সমুন্নত করেন। তিনি পূর্ব থেকেই তার নাম সমুন্নত করেছেন। ফলে আযানইকামত ইত্যাদিতে আল্লাহর নামের সাথে সাথে তার নামও শামিল করে দিয়েছেনতার দ্বীন পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেনপ্রবল করেছেনতার শরীয়তের কাজ কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছেন এবং তার শরীয়তের হেফাযতের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে আখেরাতে তার সম্মান এই যেতার স্থান সমগ্র সৃষ্টির উর্ধে রেখেছেন এবং যে সময় কোন নবী ও ফেরেশতার সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে নাতখনও তাকে সুপারিশের ক্ষমতা দিয়েছেনযাকে মাকামে-মাহমুদ” বলা হয়। মনে রাখা প্রয়োজন যেরাসূলের উপর সালাত প্রেরণের ক্ষেত্রে সালাত শব্দ দ্বারা একই সময়ে একাধিক অর্থ (রহমতদো'আ ও প্রশংসা) নেয়ার পরিবর্তে সালাত শব্দের এক অর্থ নেয়াই সঙ্গত অর্থাৎরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানপ্রশংসা ও শুভেচ্ছা। [ইবনুল কাইয়্যেমজালাউল আফহাম]

আয়াতের আসল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করার আদেশ দান করা। কিন্তু তা এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যেপ্রথমে আল্লাহ স্বয়ং নিজের ও তাঁর ফেরেশতাগণের দরূদ পাঠানোর কথা উল্লেখ করেছেন। অতঃপর সাধারণ মুমিনগণকে দরূদ প্রেরণ করার আদেশ দিয়েছেন

অধিকাংশ ইমাম এ বিষয়ে একমত যেকেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উল্লেখ করলে অথবা শুনলে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। [কুরতুবীফাতহুল কাদীর]



কেননাহাদীসে এরূপ ক্ষেত্রে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব হওয়া বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: সেই ব্যক্তি অপমানিত হোক যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে সালাত পাঠ করে না’ [তিরমিয়ী: ৩৫৪৫] অন্য এক হাদীসে আছে- সেই ব্যক্তি কৃপণযার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরূদ পাঠ করে না[তিরমিয়ী: ৩৫৪৬]



নবী সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্যের জন্য সালাত’ পেশ করা জায়েয কিনাএ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি দলকাযী ঈয়াদের নাম এ দলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যএকে সাধারণভাবে জায়েয মনে করে। এদের যুক্তি হচ্ছেকুরআনে আল্লাহ নিজেই অ-নবীদের ওপর একাধিক জায়গায় সালাতের কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়া সাল্লামও একাধিকবার অ-নবীদের জন্য সালাত শব্দ সহকারে দো'আ করেন

 যেমন একজন সাহাবীর জন্য তিনি দো'আ করেনহে আল্লাহ! আবু আওফার পরিজনদের ওপর সালাত পাঠাও। জাবের ইবনে আবদুল্লাহর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রীর আবেদনের জবাবে বলেনআল্লাহ তোমার ও তোমার স্বামীর ওপর সালাত পাঠান। যারা যাকাত নিয়ে আসতেন তাদের পক্ষে তিনি বলতেনহে আল্লাহ! ওদের উপর সালাত পাঠাও। সা'দ ইবনে উবাদার পক্ষে তিনি বলেনহে আল্লাহ! সা'দ ইবন উবাদার পরিজনদের ওপর তোমার সালাত ও রহমত পাঠাও। আবার মুমিনের রূহ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর দিয়েছেন যেফেরেশতারা তার জন্য সালাত পাঠ করে। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশের মতে এমনটি করা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য তো সঠিক ছিল। কিন্তু আমাদের জন্য সঠিক নয়। তারা বলেনসালাত ও সালামকে মুসলিমরা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। এটি বর্তমানে তাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাই নবীদের ছাড়া অন্যদের জন্য এগুলো ব্যবহার না করা উচিত


 এ জন্যই উমর ইবনে আবদুল আযীয একবার নিজের একজন শাসনকর্তকে লিখেছিলেন, “আমি শুনেছি কিছু বক্তা এ নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে শুরু করেছেন যেতারা আস-সালাতু আলান নাবী'-এর মতো নিজেদের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারীদের জন্যও সালাত” শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমার এ পত্র পৌঁছে যাবার পরপরই তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সালাতকে একমাত্র নবীদের জন্য নির্দিষ্ট করে অন্য মুসলিমদের জন্য দো'আ করেই ক্ষান্ত হবার নির্দেশ দাও” [রূহুল-মা'আনী]



এ হুকুমটি নাযিল হবার পর বহু সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেনহে আল্লাহর রাসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদের বলে দিয়েছেন। (অর্থাৎ নামাযে "আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবীইয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ” এবং দেখা সাক্ষাত হলে "আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ" বলা।) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পাঠাবার পদ্ধতিটা কি[দেখুন,তাবারী,কুরতুবী,তাহরীর ওয়া তানওয়ীর] এর জবাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন সময় যেসব সালাত বা দরূদ শিখিয়েছেন তা বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন :

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ 
[বুখারীঃ ৩৩৬৯৬৩৬০৯৭৯]



اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ 
[বুখারীঃ ৩৩৭০]




اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ
[বুখারীঃ ৪৭৯৮]



اللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ وَعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَآلِ إِبْرَاهِيْمَ وَبَرِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِإِبْرَاهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ
[মুসনাদে আহমাদঃ ৪/১১৯]



নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরূদ পড়ার ফযীলত সংক্রান্ত অনেক হাদীস রয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে ফেরেশতারা তার প্রতি দরূদ পাঠ করে যতক্ষণ সে দরূদ পাঠ করতে থাকে” [মুসনাদে আহমাদ:৩/৪৪৫ইবনে মাজাহ: ৯০৭] আরো বলেছেন, “যে আমার ওপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ তার ওপর দশবার দরূদ পড়েন” [মুসলিম: ৩৮৪] অন্য হাদীসে এসেছেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনকিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকার সবচেয়ে বেশী হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশী দরূদ পড়বে” [তিরমিয়ী: ৪৮৪] আরো বলেছেনআমার কথা যে ব্যক্তির সামনে আলোচনা করা হয় এবং সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না সে কৃপণ। [তিরমিযী: ৩৫৪৬]।



৪/৩. তাফসীর ফাতহুল মাজীদ :
বলেন: (নাবীর প্রতি) আল্লাহ তাআলার সালাত হলো: ফেরেশতাদের কাছে তাঁর প্রশংসা করা। আর ফেরেশতাদের সালাত হলো: নাবীর জন্য দুআ করা। (সহীহ বূখারীঅত্র আয়াতের তাফসীর).এ আয়াতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যা আসমানে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতাদের নিকট বিদ্যমান। তা এই যেআল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের নিকট নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করেন

 আর ফেরেশতাগণও নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদার জন্য দুআ করেন। তার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীকে আদেশ করছেন তারাও যেন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করে। যাতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় জগৎ একত্রিত হয়ে যায়। আবুল আলিয়া (রা.) বলেন: (নাবীর প্রতি) আল্লাহ তাআলার সালাত হলো: ফেরেশতাদের কাছে তাঁর প্রশংসা করা। আর ফেরেশতাদের সালাত হলো: নাবীর জন্য দুআ করা। [সহীহ বূখারীঅত্র আয়াতের তাফসীর]।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পড়ার জন্য উম্মাতের প্রতি তাঁর নির্দেশ ও পদ্ধতি:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মাতকে দরূদ পড়ার ব্যাপারে অনেক জায়গায় নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ ব্যাপারে মুতাওতির হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো কাব বিন উজরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: বলা হলো হে আল্লাহ তাআলার রাসূল! আপনাকে কিভাবে সালাম দেব তা জানতে পারলাম। কিন্তু সালাত কিভাবে পড়বতখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরূদে ইবরাহীমের কথা বললেন। [সহীহ বুখারী হা: ৪৭৯৭]।



এছাড়াও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাতে শব্দের একটু ভিন্নতা পাওয়া যায়। তবে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার উত্তম শব্দ ও দরূদ হলো দরূদে ইবরাহীম। তবে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু কিছু দরূদ পাওয়া যায় যেমন :
يا نبي سلام عليك يا حبيب سلام عليك
এগুলোর কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নেই। এগুলো একশ্রেণির নামধারী তথাকথিত আলেম নামক ধর্মব্যবসায়ীদের তৈরি করা কথা। তাই চার রাকাতবিশিষ্ট সালাতের উভয় বৈঠকে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব। আবার কেউ সুন্নাত বলেছেন। [ইবনু কাসীরঅত্র আয়াতের তাফসীর]।



তাছাড়া আযান শেষেমসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পূর্বেজানাযার সালাতেঈদের সালাতেআল্লাহ তাআলার কাছে কিছু চেয়ে দুআ করার শেষে ও কবর যিয়ারতের সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। [ইবনু কাসীরঅত্র আয়াতের তাফসীর]।


রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার পদ্ধতি:
পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা যায় এবং সে দরূদ আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছে দেন। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন তোমরা আমার কবরকে অনুষ্ঠানের জায়গা বানিয়ে নিও না এবং তোমাদের বাড়ি ঘরকে কবর বানিয়ে নিও নাআর তোমরা আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ কর। তোমরা যেখান থেকেই আমার প্রতি দরূদ পাঠ কর তা আমার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। [আবূ দাঊদ হা: ২০৪২সনদ সহীহ]।


অন্য বর্ণনায় রয়েছেতিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: জমিনে আল্লাহ তাআলার কতগুলো ভ্রাম্যমান ফেরেশতা রয়েছেতারা আমার উম্মাতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেয়। [আহমাদ ১/৪৪১নাসায়ী হা: ১২৮১সনদ সহীহ]।


অতএব নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম ও তাঁর প্রতি দরূদ প্রেরণের জন্য পাখি হয়ে মদীনাতে যেতে হবে না এবং কোন হাজী সাহেবকেও বলে দিতে হবে না যেআমার সালাম নাবীর রওজায় পৌঁছে দেবেন। বরং পৃথিবীর যেখান থেকেই দরূদ পাঠ করা হোক না কেন তা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছে যাবে

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার ফযীলত ও না পাঠ করলে অপরাধ:
নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। [সহীহ মুসলিম ১/৩০৬আবূ দাঊদ হা: ১৫৩০]।



তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোয় ধূসরিত হোকযে ব্যক্তির নিকট আমার নাম উচ্চারণ করা হলো কিন্তু আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
الْبَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ، ثُمَّ لَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ
সে ব্যক্তি কৃপণ যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরূদ পাঠ করে না। [মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৩৬সহীহ]।



সুতরাং যে কোন আমল সুন্নাতী তরীকায় আদায় করলে তার নেকীর আশা করা যায়অন্যথায় তার কোন নেকী পাওয়ার আশা করা যায় না বরং পাপের ভাগী হতে হবে



৫. আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
ক. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল
খ. স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এবং ফেরেশতারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করেন
গ. যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করে না সে হল বড় কৃপণ
ঘ. সুন্নাতী দরূদ পাঠ করতে হবেকোন প্রকার বিদআতী দরূপ পাঠ করা যাবে না



৬. রাসূল (সাঃ)-এর সম্মানে কাসীদা (কবিতা) :
قَصِيْدَةُ فِيْ مَدْحِ رَسُوْلِ اللهِ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসংশায় আরবি কবিতা
 مُحَمَّدٌ سَيِّدُ الْكَوْنَيْنِ وَالثَّقَلَيْنِ # وَالْفَرِيْقَيْنِ مِنْ عَرَبٍ وَمِنْ عَجَمِ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, দু’জাহানের মহান নেতা
আরব-আজম অধিপতি, বিশ্বগুরু জগত জেতা।
هُوَ الْحَبِيْبُ الَّذِيْ تُرْجٰى شَفَاعَتُهُ # لِكُلِّ هَوْلٍ مِّنَ الْأَهْوَالِ مُقْتَحِمِ
প্রিয় সখা খোদ এলাহির, পরকালের কান্ডারী সে
কঠোর কঠিন বিপদকালে, মুক্তি দয়ার ভান্ডারী সে।
بُشْرٰى لَنَا مَعْشَرَ الإِسْلَامِ إِنَّ لَنَا # مِنَ الْعِنَايَةِ رُكْنًا غَيْرَ مُنْهَدَمِ
ভাগ্য দারাজ এ মিল্লাতের, আল্লাহর প্রিয় রাসূল আল-আমীন
করলো কায়েম এমন খুঁটি, ধ্বংস যাহার নেই কোনো দিন। [তথ্যসূত্র : কাসীদা-ই বুরদা]।




০৭. উপসংহারঃ
রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠের মাধ্যমে সম্মান বৃদ্ধি, গুণাহ মাফসহ আরো অন্যান্য উপকারিতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সদা-সর্বদা সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমীন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement