Ads code

ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলা সকল মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব।


উমার কর্তৃক ১১ রাকাতের নির্দেশ-সংবলিত বর্ণনার তাহকিক : উত্থাপিত বিভ্রান্তি নিরসন

[এটি একটি একাডেমিক গবেষণা ও তাহকিক। রাকাত নিয়ে নোংরা মারামারি নয়। কোনো পক্ষ সমর্থন করেও লিখা নয়। বরং শাস্ত্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী উমার কর্তৃক ১১ রাকাতের নির্দেশ-সংবলিত বর্ণনার তাহকিক করা হয়েছে মাত্র। এখানে ২০ রাকাতের গ্রহণযোগ্য বর্ণনার বিরোধিতা করা হচ্ছে না। উমার কর্তৃক নির্দেশনার বিষয়টি মূল বিষয়। পাঠকগণ সেটা মাথায় রেখেই পড়বেন। তা ছাড়া আলোচনা যেহেতু একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে, তাই একটি কথা বলা সমীচীন মনে করছি। উলুমুল হাদিসের অনেক কিছুই সাধারণ পাঠক হয়তো বুঝবেন না। এখানে বাধ্য হয়েই আমরা শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করছি। আহলুল হাদিস ওয়াল ফিকহের উলামায়ে কিরামের মানহাজ ও রীতির অবিকৃত ধারাকে যেকোনো ধরনের অপব্যাখ্যা কিংবা পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে মুক্ত রাখা জরুরি]

উমার (রাদিআল্লাহু আনহু) কর্তৃক ১১ রাকাতের নির্দেশনা-সংবলিত বর্ণনাটিকে কেউ মুযতারিব প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, আর কেউবা চেষ্টা করেছেন শায প্রমাণের। বিগত এক পোস্টে সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করেছিলাম যে, এটি মুযতারিব নয়। এমনকি মুযতারিবের সংজ্ঞায়ও পড়ে না। কিন্তু ইতোমধ্যেই বিভিন্নজনের কাছ থেকে এক লেখকের একটা তাহকিকের লিংক আমার কাছে এসেছে। যাতে লেখক মহোদয় বর্ণনাটির একাধিক সূত্র দেখিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে, উমার কর্তৃক ১১ রাকাতের বর্ণনাটি মাত্র একসূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আর ২০ রাকাতের বর্ণনা একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এটাই এগারোর উপর প্রধান্যলাভ করেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি না সনদগুলোর মান নিয়ে কোনো আলোচনা করেছেন, আর না রাবিদের অবস্থা নিয়ে! আহলুস সুন্নাহর উলামারা তো আলোচনার গভীরে প্রবেশ করেন। কেবল ভাসা ভাসা তথ্যনির্ভর কথাবার্তা শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজ নয়।

আমরা প্রথমেই বর্ণনাটি জেনে নিই :

عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يُوسُفَ ، عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ ، أَنَّهُ قَالَ : أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ، وَتَمِيمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً. قَالَ : وَقَدْ كَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ بِالْمِئِينَ، حَتَّى كُنَّا نَعْتَمِدُ عَلَى الْعِصِيِّ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ، وَمَا كُنَّا نَنْصَرِفُ إِلَّا فِي فُرُوعِ الْفَجْرِ 

‘মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ থেকে বর্ণিত, তিনি সায়িব ইবনু ইয়াযিদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি (সায়িব) বলেন, “উমার ইবনুল খাত্তাব উবাই ইবনু কাব ও তামিম আদ-দারিকে নির্দেশ দিয়েছেন- তারা যেন লোকদের নিয়ে এগার রাকাত সালাত কায়িম করেন। বর্ণনাকারী বলেন, কারি (ইমাম) শত শত আয়াত তিলাওয়াত করতেন। ফলে দীর্ঘ কিয়ামের দরুণ আমরা লাঠিতে ভর করে দাঁড়াতাম। আর আমরা ফজরের কাছাকাছি সময়ে এসে সালাত শেষ করতাম।”’ (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং : ৩০২) 

লেখকের দাবিটা ছিল, উমার কর্তৃক নির্দেশিত উক্ত কাজটির বর্ণনাকারী হলেন সাহাবি সায়িব ইবনু ইয়াযিদ। আর সায়িব থেকে বর্ণনা করেছেন তার তিনজন ছাত্র। যথা,

১. ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ
২. হারিস বিন আবি যুবাব
৩. মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ

তন্মধ্যে প্রথমোক্ত দুইজন থেকে যারাই বর্ণনা করেছেন, সকলেই ২০ রাকাতের কথা বলেছেন। আর শেষেরজন (মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ) থেকে তার তিন ছাত্র তিন রকম বর্ণনা করেছেন। যথাক্রমে-

১. ইমাম মালিক- ১১ রাকাত
২. মুহাম্মাদ বিন ইসহাক- ১৩ রাকাত
৩. দাউদ ইবনু কাইস- ২০ রাকাত।

তারপর তার বক্তব্য হলো, “পাঠক আপনিই বলুন, যার দুই ছাত্রের বর্ণনা একই রকম, তা গ্রহণ করবেন? নাকি যার আরেক ছাত্র থেকে তিন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়, তা থেকে একটি গ্রহণ করবেন? নিশ্চয় দুই ছাত্রেরটাই গ্রহণ করবেন। কাজেই ২০ রাকাআতের বর্ণনা প্রাধান্য পাবে।”

শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিরা সাধারণ পাঠকদের এভাবে সরলীকরণ বুঝ দিয়ে হাদিসশাস্ত্রের উসুল-মূলনীতি, এ সংক্রান্ত অন্যান্য বর্ণনাগুলো কি ইচ্ছেকৃত এড়িয়ে গেছেন, না কি চোখে পড়েনি, সেই বিচার আমরা করব না। তবে আমরা এ ধরনের একপাক্ষিক আচরণ থেকে আল্লাহর পানাহ চাই। উচিত ছিল সবগুলো বর্ণনা সামনে এনে তারপর মতামত পেশ করা। যাই হোক, পাঠক বিস্তারিত তাহকিকে প্রবেশ করি চলুন। 

বিস্তারিত তাহকিক :

প্রথম আলোচনা :

১.
সাহাবি সায়িব ইবনু ইয়াযিদের তিনজন ছাত্রের একজন হলেন হারিস বিন আবি যুবাব। তার থেকে বর্ণনা করেছেন ইবরাহিম ইবনু মুহাম্মাদ আসলামি। আর তার থেকে ইমাম আবদুর রাযযাক ‘আল-মুসান্নাফ’ গ্রন্থে (হাদিস নং : ৭৯৭৬) এটা উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটা হলো,

عبد الرزاق، عَنِ الْأَسْلَمِيِّ، عَنِ الْحَارِثِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي ذُبَابٍ، عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: كُنَّا نَنْصَرِفُ مِنَ الْقِيَامِ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ، وَقَدْ دَنَا فُرُوعُ الْفَجْرِ، وَكَان الْقِيَامُ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ ثَلَاثَةً وَعِشرِينَ رَكْعَةً

‘সায়িব ইবনু ইয়াযিদ বলেন, “আমরা উমারের যুগে ফজরের নিকটবর্তী সময়ে কিয়াম থেকে ফিরতাম। আর উমারের যুগে উক্ত কিয়াম ছিল ২৩ রাকাত।”’

এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় :

১. উক্ত বর্ণনায় উমার কর্তৃক ২৩ রাকাত সালাতের নির্দেশের উল্লেখ নেই; বরং এখানে তার যুগের আমল বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে ১১ রাকাতের বর্ণনাটিতে উমারের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। যেটি সহিহ।

২. বর্ণনাকারী হারিস মুখতালাফ ফিহ রাওয়ি। অর্থাৎ তার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই ধরণের মন্তব্যই রয়েছে।

৩. আর হারিস থেকে বর্ণনাকারী ইবরাহিম ইবনু মুহাম্মাদ আসলামি হলো দয়িফ জিদ্দান (মারাত্মক পর্যায়ের দয়িফ)।

ফলাফল : বর্ণনাটা পরিত্যাজ্য।

২.
সাহাবি সায়িব ইবনু ইয়াযিদের তিন ছাত্রের আরেকজন হলেন ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ। তার বর্ণনায় ২০ রাকাতের কথা এসেছে। কিন্তু সায়িবের অপর ছাত্র মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের বর্ণনায় ১১ রাকাতের উল্লেখ হয়েছে (যেটি শুরুতেই আমরা দেখেছি)। 

ইয়াযিদ বিন খুসাইফার ২ জন ছাত্র :

১. মুহাম্মাদ বিন আবি যিব ও 
২. মুহাম্মাদ বিন জাফর।

তারা উভয়েই ইয়াযিদ থেকে ২০ রাকাতের কথা বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাদুটি হলো, 

১.
قال علِيٌّ بن الجعد أنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ خُصَيْفَةَ، عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً، وَإِنْ كَانُوا لَيَقْرَءُونَ بِالْمِئِينَ مِنَ الْقُرْآنِ

‘ইয়াযিদ সায়িব থেকে বর্ণনা করে বলেছেন, “তারা উমারের যুগে রামাদান মাসে ২০ রাকাত কিয়াম করতেন। যদিও তারা কুরআনের শত শত আয়াত তিলাওয়াত করতেন।”’ (আলি ইবনুল জাদ, আল-মুসনাদ, হাদিস নং : ২৮২৫) এটা ইমাম বাইহাকিও আলি ইবনুল জাদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন (আস-সুনানুল কুবরা : ৪৬১৭) 

২.
قال البيهقي أخبرنا أبو طاهر الفقيه، قال : أخبرنا أبو عثمان البصري ، قال : حدثنا أبو أحمد : محمد بن عبد الوهاب ، قال : أخبرنا خالد بن مخلد ، قال : حدثنا محمد بن جعفر ، قال : حدثني يزيد بن الحصيفة ، عن السائب بن يزيد ، قال: كنا نقوم في زمان عمر بن الخطاب بعشرين ركعة والوتر

 ‘ইয়াযিদ সায়িব থেকে বর্ণনা করে বলেন, “আমরা উমারের যুগে ২০ রাকাত এবং বিতর পড়তাম।”’ (ইমাম বাইহাকি, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদিস নং : ৫৪০৯)

দেখা গেল, ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ ২০ রাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। যা তার অপর সঙ্গী মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের বর্ণনার বিপরীত। তবে এতে বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে যা আমরা ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করছি—

১. মুহাম্মাদের বর্ণনায় উমার কর্তৃক সুস্পষ্ট নির্দেশের উল্লেখ থাকলেও ইয়াযিদের বর্ণনায় তা নেই; বরং উমারের যুগের আমল বর্ণিত হয়েছে। উমার নির্দেশ দিয়েছেন মর্মে কোনো কথা নেই। এর অর্থ হলো, উমারের ১১ রাকাতের নির্দেশের পর দীর্ঘ কিয়ামের ফলে মুসল্লিদের যে কষ্ট হতো এবং লাঠিতে ভর দিয়ে দাড়াতেন, সেটা লাঘবের জন্য পরে তারা রাকাতসংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যা সালাফদের অনেকের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত। উক্ত বর্ণনায় সে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আমলের বিবরণই এসেছে।

২. ইয়াযিদের ছাত্র মুহাম্মাদ বিন জাফরের সনদ (যা ইমাম বাইহাকি উল্লেখ করেছেন) অত শক্তিশালী নয়। করণ, প্রথমত মুহাম্মাদ বিন জাফর সিকাহ হলেও ইমাম যাহাবি বলেছেন,

لَمْ يَقَع لَنَا حَدِيْثُه عَالِياً، إِلاَّ مِنْ نَمَطِ مَا فِي صَحِيْحِ البُخَارِيِّ

‘সহিহ বুখারিতে বর্ণিত তার কিছু হাদিস ছাড়া তার অন্য কোনো হাদিস আমাদের কাছে উচ্চভাবে (শক্তিশালী সনদে) পৌঁছায়নি।’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা, রাবি নং : ১০৯)

দ্বিতীয়ত, মুহাম্মাদ বিন জাফরের ছাত্র খালিদ বিন মাখলাদ আল-কাতাওয়ানি হলেন মুখতালাফ ফিহ রাবি। সহিহ বুখারিতে তার বর্ণিত হাদিস থাকলেও ইমামগণ তাকে একক ও অপরিচিত হাদিস বর্ণনার দোষে অভিযুক্ত করেছেন। ইমাম আহমাদ, ইবনু সাদ, আযদি প্রমুখ তাকে অন্যদের বিপরীতে একক হাদিস বর্ণনার কারণে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলেছেন। (এই পরিভাষাটি নিয়ে সামনে আলোচনা আসবে) এমনকি ইবনু হাজার বলেছেন, صدوق يتشيع وله أفراد ‘তিনি সদুক (সিকাহ ও দয়িফের মাঝামাঝি স্তর), শিয়া মতবাদে ধাবিত ছিলেন এবং তার অনেক একক বর্ণনা রয়েছে।’ (তাকরিবুত তাহযিব, রাবি নং : ১৬৭৭)

এ হলো ইয়াযিদ বিন খুসাইফার ছাত্র মুহাম্মাদ বিন জাফরের সূত্রে বর্ণিত সনদের আলোচনা। যা ইমাম বাইহাকি উল্লেখ করেছেন। আর ইয়াযিদের অপর ছাত্র মুহাম্মাদ বিন আবি যিবের সনদ, যা মুসনাদু আলি ইবনিল জাদে উল্লেখ আছে, সেটা সহিহ। তবে সেটা যেহেতু মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের ১১ রাকাতের বিপরীত বর্ণনা, তাই তাদের উভয়ের বর্ণনার তাহকিক পেশ করছি।

৩. ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ ও মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ :

উভয়েই সায়িবের ছাত্র। ইতোপূর্বে আমরা উভয়ের বর্ণনার অসঙ্গতি দেখেছি। তন্মধ্যে একটা হলো, মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ উমার কর্তৃক ১১ রাকাতের নির্দেশ-সংবলিত বর্ণনা দিয়েছেন, আর ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ ২০ রাকাতের আমলের বর্ণনা দিয়েছেন। এর অর্থ আগেই বলেছি যে, উমারের ১১ রাকাতের নির্দেশের পর দীর্ঘ কিয়ামের ফলে মুসল্লিদের যে কষ্ট হতো এবং লাঠিতে ভর দিয়ে দাড়াতেন, সেটা লাঘবের জন্য পরে তারা রাকাতসংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইয়াযিদের ২০ রাকাতের বর্ণনায় সে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আমলের বিবরণই এসেছে। তবুও কোনো বিষয়ে উভয়ের বর্ণনা পরস্পরবিরোধী হলে ইয়াযিদের চেয়ে মুহাম্মাদের বর্ণনাই অধিক গ্রহনযোগ্য হয়। এর কারণ হলো, ইয়াযিদ সিকাহ হওয়া সত্ত্বেও অন্য সিকাহদের বিপরীতে একক বর্ণনা করতেন। এজন্যই ইমাম আহমাদ বিন হানবাল (রাহিমাহুল্লাহ) ইয়াযিদ বিন খুসাইফাকে মুনকারুল হাদিস বলেছেন।

মুনকারুল হাদিস পরিচিতি :

মুনকারুল হাদিস (منكر الحديث) শব্দটা জারহ-তাদিল (হাদিস-বর্ণনাকারীদের প্রতি মুহাদ্দিসগণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য) শাস্ত্রের একটা প্রসিদ্ধ পরিভাষা। শব্দটা একাধিক পরিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ অর্থে মুনকারুল হাদিস বলা হয়, যে রাবি (বর্ণনাকারী) হাদিস সংরক্ষণে দুর্বলতাসহ অন্য সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবিদের বিপরীত বর্ণনা করে থাকে। তার বর্ণিত হাদিস বিবেচনাধীন রেখে লিখে রাখা যায়, তবে তা প্রমাণ হিসেবে পেশ করার উপযুক্ত নয়। যেমন, ইমাম আবু হাতিম রাযি ইবরাহিম ইবনু আবি হাবিবাহর ব্যাপারে বলেছেন, "শাইখ মজবুত নয়; তার হাদিস লিখা যায়, তবে এর দ্বারা দলিল দেওয়া যায় না।"

উল্লেখ্য, কারো হাদিস লিখা যাবে বা যাবে না কথাটি বর্তমান যুগের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং সনদসহ হাদিস বর্ণনা ও এর সংরক্ষণের সময়-কালের কথা। সেসময় সনদসহ হাদিস সংরক্ষণ প্রধানত মুখস্তশক্তি ও লিখে রাখার মাধ্যমে হতো।

মুনকারুল হাদিস পরিভাষায় ইমাম বুখারির উদ্দেশ্য হয় ভিন্ন। তিনি যাকে মুনকারুল হাদিস বলেন, এর অর্থ হলো লোকটা দয়িফ জিদ্দান বা মারাত্মক পর্যায়ের দয়িফ, যার বর্ণিত হাদিস সিকাহ রাবিদের বর্ণনার বিপরীত হয়ে থাকে। তাদের বর্ণিত হাদিস দলিল হিসেবেও উপুক্ত নয়, বিবেচনায়ও রাখা যায় না। যেমন, মুহাম্মাদ ইবনু যাদান আল-মাদানির ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “সে মুনকারুল হাদিস, তার হাদিস লিখা যাবে না।”

অপরদিকে ইমাম আহমাদ বিন হানবাল কাউকে মুনকারুল হাদিস বলার অর্থ হলো, সে লোকটি নির্দিষ্ট একটা হাদিস এককভাবে বর্ণনা করেছে, যে হাদিসটির মাতন (ভাষ্য) অন্য সিকাহ রাবিদের বর্ণনায় জানাশোনা পাওয়া যায় না। যদিও ব্যক্তিটি সিকাহ হোক না কেন। যেমন, ইয়াযিদ ইবনু খুসাইফাহকে তিনি সিকাহ বলেও অন্যত্র তাকে মুনকারুল হাদিস বলেছেন। স্পষ্ট যে, আহমাদ বিন হানবালের সংজ্ঞামতে কেউ সিকাহ হওয়ার পাশাপাশি মুনকারুল হাদিসও হতে পারে। (মু'জামু মুসতালাহাতিল উলুমিশ শারইয়্যাহ, খণ্ড : ৩, পৃষ্টা : ১৬৩৬)

ইবনু হাজার বলেছেন,

هذه اللفظة يطلقها أحمد على من يغرب على أقرانه بالحديث عرف ذلك بالاستقراء من حاله، وقد احتج بابن خصيفة مالك والأئمة كلهم

‘এই শব্দটি (মুনকারুল হাদিস) ইমাম আহমাদ ওই লোকের উপর প্রয়োগ করেন, যে তার অন্য সাথীদের বিপরীতে অপরিচিত হাদিস বর্ণনা করে। আর সেটা বর্ণনাকারীর হালত অনুসন্ধান করে জানা যায়। তবে ইবনু খুসাইফার (বর্ণিত অন্যান্য) হাদিস দিয়ে মালিক ও অন্য ইমামরা দলিলগ্রহণ করেছেন।’ (হাদয়ুসসারি, পৃষ্ঠা : ৪৫৩)

ইমাম নববি বলেছেন,

 هو معنى المنكر عند المحدثين؛ فإنهم قد يطلقون المنكر على انفراد الثقة بحديث

‘মুহাদ্দিসগণের নিকট এটিই মুনকারের অর্থ। তারা সিকাহ রাবির একক হাদিস বর্ণনার উপর মুনকার শব্দটি প্রয়োগ করেন।’ (আল-মিনহাজ, পৃষ্ঠা : ৫৭) 
তাই ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ সিকাহ এবং তার হাদিস বুখারি-মুসলিমে থাকলেও যেসব ক্ষেত্রে তিনি অন্য সিকাহর বিপরীতে এককভাবে বর্ণনা করবেন, সেটা প্রাধান্য পাবে না।

ফলাফল : ইয়াযিদ বিন খুসাইফার ২০ রাকাতের বর্ণনার তুলনায় মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের ১১ রাকাতের বর্ণনাটি অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত ও শক্তিশালী।

লেখক বলেছিলেন, ইয়াযিদ বিন খুসাইফাহ থেকে ইমাম মালিকও নাকি ২০ রাকাতের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি এর স্বপক্ষে ইবনু হাজারের ফাতহুল বারির নাম উল্লেখ করেন। অথচ ইবনু হাজার নিজেও এর কোনো রেফারেন্স, সূত্র ও সনদ দেখাননি। তাই এটা সূত্র ও সনদবিহীন একটা কথা। 

দ্বিতীয় আলোচনা :

লেখক বলেছেন মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের ছাত্র ৩ জন। অথচ তাঁর থেকে মোট আটজন রাবি বর্ণনা করেছেন। আশ্চর্য হতে হয়, এ কেমন শাস্ত্রজ্ঞ আচরণ! আমরা কাউকে মিথ্যবাদী বলছি না, তবে কোনো কিছুতে কলম ধরলে জেনেশুনেই ধরা উচিত। যাই হোক, সেই  ৮ জন রাবি হলেন,

১. দাউদ ইবনু কাইস
২. মুহাম্মাদ বিন ইসহাক
৩. ইমাম মালিক
৪. ইসমাইল ইবনু জাফার
৫. ইয়াহইয়া ইবনু সায়িদ
৬. ইসমাইল ইবনু উমাইয়াহ
৭. উসামাহ ইবনু যাইদ
৮. আবদুল আযিয ইবনু মুহাম্মাদ

তাদের মধ্যে দাউদ বলেছেন ২১ রাকাতের কথা, আর মুহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেছেন ১৩ রাকাতের কথা। এছাড়া বাকি ৬ জনই ১১ রাকাতের কথা বর্ণনা করেছেন। ১৩ রাকাতের বর্ণনাটি হলো, যা ইমাম আবু বাকর নিশাপুরি বর্ণনা করেছেন : 

حدثنا أبو الأزهر، ثنا يعقوب بن إبراهيم، حدثني أبي، عن ابن إسحاق، قال حدثني محمد بن يوسف بن عبد الله بن أخت السائب، عن السائب، قال: كنّا نصلي في زمن عمر رضي الله عنه رمضان ثلاث عشرة ركعة، وما كنا نخرج إلاّ في وِجاه الصُّبح كان القارئ يقرأ في كل ركعة خمسين آية ستين آية
(আবু বাকর নিশাপুরি, আল-ফাওয়ায়িদ, বর্ণনা নং : ১৯)

এটি ১১ রাকাতের বর্ণনার তুলনায় দুর্বল। কারণ হলো,

১. প্রথমত, এই বর্ণনায় উমারের নির্দেশের উল্লেখ নেই; বরং তার যুগের আমলের বিবরণ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১১ রাকাতের বর্ণনাকারীরা সবাই সিকাহ। অথচ মুহাম্মাদ বিন ইসহাক সিকাহ নন; বরং তিনি সদুক। যা সিকাহর নিচের স্তর। ইবনু হাজার বলেছেন, তার একক বর্ণনা সহিহ’র স্তরে পৌঁছে না (ফাতহুল বারি : ১১/১৬৩)। পাশাপাশি আবু বাকর নিশাপুরির উসতায আবুল আযহার আহমাদ ইবনুল আযহারও সদুক রাবি।

২. অন্য সকলের বর্ণনাতেই কারিদের কিরাআত পাঠের বিবরণ এসেছে যে, তারা শত শত আয়াত তিলাওয়াত করতেন। কিন্তু ইবনু ইসহাক বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, كان القارئ يقرأ في كل ركعة خمسين آية ستين آية “কারি প্রতিটি রাকাতে ৫০-৬০ আয়াত করে পড়তেন।”

ফলাফল : এটা একাধিক ক্ষেত্রে সিকাহ রাবিদের বিপরীতে বর্ণিত হয়েছে। তাই মাহফুয না হওয়ায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাকি রইল দাউদ ইবনু কাইসের ২১ রাকাতের বর্ণনা। এটি মুসান্নাফ আবদুর রাযযাকে (হাদিস নং : ৭৯৭৩) উল্লেখ রয়েছে। ইমাম আবদুর রাযযাক সরাসরি দাউদ ইবনু কাইস থেকেই বর্ণনা করেছেন। তা হলো,

أَنَّ عُمَرَ: جَمَعَ النَّاسَ فِي رَمَضَانَ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، وَعَلَى تَمِيمٍ الدَّارِيِّ عَلَى إِحْدَى وَعِشْرِينَ رَكْعَةُ  يَقْرَءُونَ بِالْمِئِينَ وَيَنْصَرِفُونَ عِنْدَ فُرُوعِ الْفَجْرِ

দাউদ সিকাহ রাবি। কিন্তু তিনি মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের অন্য ৬ জন সিকাহ ছাত্রের ১১ রাকাত-সংবলিত বর্ণনার বিপরীতে ২১ রাকাতের বর্ণনা দিয়েছেন। [৬ জনের বর্ণনাগুলো দেখতে পারেন— দেখুন : মুয়াত্তা মালিক, ৩০২; আল-জুয লি-ইসমাইল ইবনি জাফার, ৪৪০; আখবারুল মাদিনাহ লি- উমার ইবনি শাব্বাহ আন-নুমাইরি, ২/৭১৩; ফাওয়াইদুন নাইসাবুরি, ১৬, ১৭; সুনানু সায়িদ ইবনি মানসুর]।

যেহেতু দাউদ সিকাহ হওয়া সত্ত্বেও অন্য একাধিক সিকাহ রাবির বিপরীত বর্ণনা করেছেন, তাই হাদিসশাস্ত্রের উসুল অনুযায়ী তার বর্ণনাটা শায হয়ে যায়, যা দয়িফেরই একটা প্রকার।

ফলাফল : উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু ১১ রাকাতের নির্দেশ দিয়েছিলেন এটিই মাহফুয ও সহিহ বর্ণনা। তিনি ২০ রাকাতের নির্দেশ দেননি। বরং পরবর্তীতে লোকেরা রাকাতসংখ্যা বাড়িয়ে নিয়েছে।

উল্লেখ্য, লেখক মহোদয় ২০ রাকাতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে একাধিক বর্ণনা দেখিয়েছেন। এর মধ্যে দাউদের উক্ত বর্ণনার কথাও বলেছেন। দাউদের বর্ণনায় তো ১ রাকাত বিতরসহ ২১ রাকাতের কথা এসেছে। অথচ উনাদের মতে ১ রাকাত কোনো সালাতই হয়না।

মোটকথা, সালাতকে নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করে ফেলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কেননা রামাদানে কিয়ামুল লাইলের রাকাতসংখ্যা নির্দিষ্ট নয়, যা আমরা আগেও বলে এসেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো রাতের সালাতকে দুই রাকাত দুই রাকাত করে ব্যাপক করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি সাওয়াবের আশা নিয়ে রামাদানে কিয়াম করবে, তার অতীতের সব পাপ মোচন হয়ে যাবে বলেও তিনি সুসংবাদ দিয়েছেন। এতেও তিনি কোনো রাকাতসংখ্যার উল্লেখ করেননি। তবে সালাতের দীর্ঘতা ও সৌন্দর্যই হলো মূল বিষয়। উমার যে ১১ রাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন, সে বর্ণনাতেই রয়েছে যে, উক্ত ১১ রাকাত অনেক দীর্ঘ ছিলো। ফজরের আগ মুহূর্তে তারা সালাত শেষ করতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু নিজেও রাতভর ১১ রাকাতই পড়তেন, যা সহিহ বুখারিতে আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনায় এসেছে। তিনি বলেছেন, এই সালাতের দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন করো না। 

তাই রাকাত নিয়ে মারামারি না করে সালাতটিকে যত দীর্ঘ ও সুন্দর করা যায় সে চেষ্টা করা উচিত। ১১, ১৩, ২১, ২৩, ৩৯, ৪১ কোনো রাকাতেই আমাদের আপত্তি নেই, বরং সবগুলোই বৈধ। বৈধ ও প্রশস্ত বিষয়ে সংকীর্ণতা, দলান্ধতা ও পক্ষপাতদুষ্টতা নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement