মুসলিমদের বিপক্ষে অমুসলিমদের সাহায্য করা
.
মাসালাটি বর্তমানে খুবি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, আমাদের (নামে) মুসলিম দেশেগুলো অমুসলিমদেরকে মুসলিমদের বিপক্ষে সাহায্য করে থাকে অথবা নীরাবতা অবলম্বন করে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে সাহায্য করা কি কুফর হবে নাকি কবিরা গুনাহ হবে
.
আলোচনার শুরুতে কিছু কথা জানা জরুরি।
যেমন,
ক। মুসলিমরা অমুসলিমদের সাহায্য নেওয়া বা করা অমুসলিমদেরকে দমনের জন্য।
খ। মুসলিমরা অমুসলিমদের সাহায্য নেওয়া বা করা মুসলিম বিদ্রোহীদের দমনের জন্য।
গ। মুসলিমরা অমুসলিমদের সাহায্য নেওয়া বা করা মুজাহিদ কিংবা সাধারণ মুসলিমদের দমনের জন্য।
.
আমাদের এখানে আলোচনার বিষয় হলো কেবল 'গ' নাম্বার বিষয় নিয়ে।
যেটাকে কুফর বলা হচ্ছে একে পরিভাষায় (التولي) তাওয়াল্লি বলে। এ দ্বারা মানুষ ইমান থেকে বের হয়ে যায়।
যেটাকে হারাম বলা হয় তার পরিভাষা হলো, (الموالاة) মুয়ালাত। যেমন, কাফেরদেরকে আগে সালাম দেওয়া ইত্যাদি।
আর জায়েজ হলো যেটা এই দুই পর্যায়ে আসে না। যেমন, নিজের অমুসলিম মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা, অমুসলিম জিম্মিদের সাথে ইনসাফ করা ইত্যাদি।
এগুলো নিয়ে পরে আলোচনা করব ইন শা আল্লাহ। এখন কেবল কুফর হওয়ার প্রকার নিয়ে আলোচনা করব মাত্র।
.
#আলোচনা:
"মুসলিমরা অমুসলিমদের সাহায্য নেওয়া বা করা মুজাহিদ কিংবা সাধারণ মুসলিমদের দমনের জন্য।"
অনেকে মনে করে মাসালাটি মনে হয় এজতেহাদি। কিন্তু মাসালাটি এজতেমায়ী অর্থাৎ পূর্বের সকল মাযহাবের সকল আলেম এমন কাজকে কুফরি বলে আখ্যায়িত করেছে।
#হানাফী মাযহাব:
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلى الْإيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُوْلئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজদের পিতা ও ভাইদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারাই যালিম।" (১)
ইমাম আবু বকর জাসসাস রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
এ আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব, তাদেরকে সাহায্য করা, তাদের থেকে সাহায্য নেওয়া এবং তাদের বিষয়কে তাদের দিকে ন্যাস্ত করা থেকে নিষেধ করেছে। -----এগুলো মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য। কেননা, তারা যখন কাফেরদের সাথে সাক্ষাৎ করত, তখন তারা তাদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করত। সুতরাং, আল্লাহ মু'মিনদেরকে এহেন আদেশ দিয়ে তাদের ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য সাধন করেছে।-- (২)
#আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّخِذُوا الۡیَهُوۡدَ وَ النَّصٰرٰۤی اَوۡلِیَآءَ ۘؔ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ؕ وَ مَنۡ یَّتَوَلَّهُمۡ مِّنۡکُمۡ فَاِنَّهٗ مِنۡهُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ
"হে মুমিনগণ, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না।"(৩)
ইমাম নাসাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব গ্রহণ নিষেধ করে আয়াত নাযিল করেছেন যে, ""হে মুমিনগণ, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।"অর্থাৎ তোমরা তাদেরকে বন্ধু বানাবে না, তাদেরকে সাহায্য করবে না ও তাদের সাহায্য চাইবে না,তাদের সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন তৈরি করবে না এবং তাদের সাথে মুমিনদের মতো মুআ'শারাত করবে না।---(৪)
"ইমাম আবু সউদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَ مَنۡ یَّتَوَلَّهُمۡ مِّنۡکُمۡ فَاِنَّهٗ مِنۡهُمۡ
"আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন।"(৫)
এরপর আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, কাফেরদের সাথে যে কোনো প্রকার মুওয়ালাত প্রকাশ করা নিষেধ। যদিও তা হাকিকতে মুওয়ালাত না-ও হয়। কেননা,যে তাদের সাথে মুওয়ালাত গ্রহণ করে সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে। এবং তারা তাদের সাথে মুওয়ালাত গ্রহণ করার কারণে মু'মিনদের কাতারে থাকতে পারে না।
তিনি আরো আলোচনা করেছেন। সংক্ষিপ্ত করার উদ্দেশ্যে সেসব আলোচনা করা হলো না। (৬)
(চলবে,ইন শা আল্লাহ)
তথ্যসূত্র
১। সুরা তাওবা,আয়াত:২৩।
২। আহকামুল কুরআন: ৩/১১৩।
৩। সুরা মায়েদা,আয়াত নং:৫১।
৪। তাফসিরে নাসাফী: ১/৪৫৩।
৫। সুরা মায়েদা,আয়াত নং:৫১।
৬। তাফসিরে আবি সউদ:৩/৪৮।
মুসলিমদের বিপক্ষে অমুসলিমদের সাহায্য করা
#মালেকী মাযহাব মতে:
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
قَولُه تعالى: وَمَن يَتَوَلَّهُمْ مِنكُمْ أي: يُعَضِّدُهم على المُسلِمين فَإِنَّهُ مِنْهُمْ بيَّن تعالى أنَّ حُكمَه كحُكمِهم، وهو يمنَعُ إثباتَ الميراثِ للمُسلِمِ من المُرتَدِّ، وكان الذي تولَّاهم ابنُ أُبيٍّ، ثمَّ هذا الحُكْمُ باقٍ إلى يومِ القيامةِ في قَطْعِ الموالاةِ
"আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, "আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে" অর্থাৎ যে তাদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে "সে নিশ্চয় তাদেরই একজন" অর্থাৎ তার হুকুমও তাদের মতো হবে। ----"(১)
#কিতাবুল কযা'-তে ইমাম বুরযুলীইউ রাহিমাহুল্লাহ-এর নাওয়াযিল ফাওয়াতে উল্লেখ আছে যে, মুসলিমদের আমির ইউসুফ ইবনে তাশফিন আল লামতুনী, সে তার জামানার আলেমদের কাছে ফাতাওয়া জানতে চেয়েছিল যে, যারা ইবনে আব্বাদ আন্দালুসিকে ফ্রান্সের নিকট এই মর্মে পত্র লিখে সাহায্য করেছিল ' তারা যেন তাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাহায্য করে', অধিকাংশ আলেম তার কুফরি ও মুরতাদ হওয়ার বিষয় ফাতাওয়া দিয়েছিল।(২)
#এমনি একটি ঘটনা ৯৮৪হি: তে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আস সা'য়াদী যিনি মরোক্কর শাসক ছিল, তিনি তার চাচা আবি মারওয়ান মু'তাসিম বিল্লাহর বিরুদ্ধে পর্তুগাল বাদশাহর কাছে সাহায্য কামনা করলে, মালেকি আলেমগণ তাকে কুফরি ও মুরতাদের ফাতাওয়া প্রদান করে।(৩)
#মাগরিবের প্রসিদ্ধ ফকিহ আবুল হাসান আলি ইবনে আব্দুস সালাম আত তাসাওয়ুলি মালেকি রাহিমাহুল্লাহকে কিছু উপদীপের ব্যক্তিদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় যারা জি-হা*দে যাওয়া থেকে বিরত থাকে এবং ফ্রান্সের মানুষদেরকে মুসলিমদের গুপ্ত তথ্য সরবরাহ করে। আর কখনও কখনও ফ্রান্সের নাসারাদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে-এমন৷ কওমের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাদেরকে সুরা মায়েদার ৫১ নাম্বার আয়াতের ভিত্তিতে তাদের ওপর কুফরের বিধান ও তাদের সাথে কাফেরদের মতো লড়াই করা হবে বলে ফাতাওয়া দেন।(৪)
আরো দেখুন, (৫)
#শাফেয়ী মাযহাব মতে:
ইমাম বায়যাবী রাহিমাহুল্লাহ তাদের সাথে তাদের বন্ধুত্বের কারণে তাদেরকে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।(৬)
ইমাম ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ-ও একি তাফসির করেছেন। (৭)
ইবনে হজর আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন,---যদি সে (তাদেরকে) সাহায্য করে ও (তাদের প্রতি) খুশি থাকে, তাহলে সে তাদের বলে গণ্য হবে।(৮)
আরো দেখুন,(৯)
#হাম্বালী মাযহাব মতে:
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "যে ব্যক্তি (আল্লাহর দুশমন) শাসকদের নিকট ধন্যা দিলো, তার হুকুমও তাদের মতো হবে। তারা যতটুকু আল্লাহ দীনের থেকে সরবে,তারা ততটুকু মুরতাদ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। সালাফরা জাকাত দিতে অস্বীকারকারীদেরকে মুরতাদ বলে আখ্যায়িত করেছে, অথচ তারা নামাজী ও রোজাদার ছিল। তারা মুসলিমদের সাথে কি*তালও করেনি৷ তাহলে যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের শত্রুদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কি*তা*ল করেছে তাদের বিধান কি হতে পারে?!(১০)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ ও ইবনে কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহ আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছে। দেখুন,(১১)
(চলবে,ইন শা আল্লাহ)
তথ্যসূত্র:
0 Comments